বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : ১৯৭৪ সালে বিএম কলেজের ছাত্র নজরুল, সদরুল ও সমরেশকে খুনের নেপথ্যে কে ছিলেন? দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও নজরুল, সদরুল ও সমরেশ খুনের রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। নতুন করে এই প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনায় আলোচিত হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই বরিশাল অঞ্চলে আওয়ামী লীগের ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে প্রধান আসামি করে আগৈলঝাড়ায় সাড়ে নয় বছর আগে ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কবির হোসেন রনিকে ‘ক্রসফায়ারে’র মাধ্যমে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়েরের পর বিএম কলেজের ছাত্র নজরুল, সদরুল ও সমরেশকে খুনের বিষয়টি আলোচনা আসে।
মঙ্গলবার (০৮ অক্টোবর) বরিশালের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেছেন ক্রসফায়ারে নিহত ছাত্রদল নেতা কবির হোসেন রনির ছেলে আশিকুর রহমান আসিফ। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, সাবেক ডিআইজি, এসপিসহ পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তা এবং অর্ধশতাধিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোখলেচুর রহমান মামলাটি এজাহার রুজু করার জন্য আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন বলে বেঞ্চ সহকারী সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন।
আসামিরা হলেন, বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, আগৈলঝাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তুজা খান ও আব্দুর রইচ সেরনিয়াবাত, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ লিটন সেরনিয়াবাত, বরিশাল রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. হুমায়ন কবির, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আকরাম হোসেন, বরিশাল জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. এহসান উল্যাহ, সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার জাহাঙ্গির মল্লিক, আগৈলঝাড়া থানার সাবেক ওসি মনিরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস ছাত্তার মোল্লা, সৈয়দ আশরাফ মিয়া, মামুন কবিরাজ, অনিমেষ মণ্ডল ও স্বপন মণ্ডল।
মামলার বরাতে আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম পান্না জানান, মামলার আসামি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, মোর্তুজা খান, রইচ সেরনিয়াবাত ও আবুল সালেহ লিটন মোল্লাসহ আওয়ামী লীগ নেতারা গত ১৫ বছর ধরে সমগ্র জেলাকে একটি নৈরাজ্য জনপদ এবং ভয়াল উপত্যকায় পরিণত করেন। রাজনৈতিকভাবে বাদীর বাবা কবির হোসেন রনি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। আসামি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে বাদীর বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্ররোচনায় পুলিশ কর্মকর্তারা ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদল নেতা রনিকে ঢাকার নবীনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে অমানুষিক নির্যাতন করে। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটায় আগৈলঝাড়া উপজেলার বাইপাস ব্রিজের পশ্চিম পাশে রাস্তায় ছাত্রদল নেতা রনিকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে সব আসামিরা বিষয়টি একযোগে ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টার নামে প্রচারণা চালায়। আসামিদের ভয়ে মামলা করতে সাহস পায়নি তার পরিবার।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আদালতে মামলা করেন বাদী। মামলায় বাদী আরও উল্লেখ করেন প্রধান আসামি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ১৯৭৪ সালে বিএম কলেজের ছাত্র নজরুল, সদরুল ও সমরেশকে রাতের আধারে গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে খুন করেছেন।
বরিশাল অঞ্চলে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ তার পরিবারের ৭ জনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একই সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। বিএফআইইউ থেকে এ সম্পর্কিত নির্দেশনা সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মানি লন্ডারিং পরিপালন করা কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) বিএফআইইউ দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়ে হিসাব জব্দ করা হয়।
বিএফআইইউর নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর পরিবারের অন্য সদস্যরা হচ্ছেন, তার প্রয়াত স্ত্রী সাহান আরা আবদুল্লাহ, হাসানাতের তিন ছেলে- এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, বরিশাল সিটির সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, সেরনিয়াবাত আশিক আবদুল্লাহ, সাদিক আব্দুল্লাহর স্ত্রী লিপি আব্দুল্লাহ ও তাদের পরিবারের আরেক সদস্য ফিরোজা সুলতানা।
বিএফআইইউয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী ৩০ দিন এসব হিসাবে কোনো লেনদেন করা যাবে না। প্রয়োজনে লেনদেন স্থগিতের সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা অনুযায়ী এসব হিসাবের লেনদেন বিবরণী, কেওয়াইসি ফরমসহ প্রয়োজনীয় তথ্য বিএফআইইউতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে সংঘটিত অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করে গত ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই বরিশাল অঞ্চলে আওয়ামী লীগের ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ আশির দশকের শেষ দিকে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। এরপর তিনি দীর্ঘদিন এই পদে ছিলেন। ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি জেলা সভাপতি হন। তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য হন। ২০০১ সালে তিনি পরাজিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেননি। এরপর ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার তিনি সংসদ সদস্য হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সংসদে চিফ হুইপ ছিলেন আবুল হাসানাত। ৯৬’এর শাসনামলে বরিশালে সন্ত্রাসের রাম রাজত্ব চালিয়ে দেশব্যাপী সমালোচিত হন হাসানাত। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক (মন্ত্রীর পদমর্যাদা) দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অদক্ষতার পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠে।
২০১৪ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরণের মৃত্যুর পর মহানগরের রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ২০১৫ সালের অক্টোবরে গঠিত ৭১ সদস্যের নগর আওয়ামী লীগের কমিটির প্রায় সবাই ছিলেন আবুল হাসানাতের অনুসারী। তার ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ হন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এরপর সাদিককে সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছিলেন হাসানাত। স্ত্রী প্রয়াত সাহান আরা বেগমকে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি করেছিলেন। ছোট ছেলে সেরনিয়াবাত আশিক আবদুল্লাহকে করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। মেজ ছেলে মঈন আবদুল্লাহ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রি’র (এফবিসিসিআই) পরিচালক পদে বনে যান।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট বিকেলে বিক্ষুব্ধ জনতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ’র নগরীর কালি বাড়ি রোডের বাসভবন ভাঙচুরের পর আগুন ধরিয়ে দেন। এতে বাড়ির বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যায়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় কালিবাড়ি রোডের বাসভবন। যেখানে সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ তার অনুসারীদের নিয়ে থাকতেন। ওইদিন বাসভবনের পিছন থেকে সাদিক তার কয়েক অনুসারী নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে অগ্নিসংযোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত বাড়ি থেকে বাড়ির দ্বিতীয় তলার কক্ষ থেকে তিনজনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে একজন হলেন নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর গাজী নঈমুল হোসেন।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply